কায়রো প্রতিনিধি:
মিশরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগ দিয়েছেন রাষ্ট্রদূত মিস সামিনা নাজ। তাঁর বিদায়ের পর মিশরপ্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন মহলে তাঁর দায়িত্বকাল নিয়ে চলছে মূল্যায়ন। একই সঙ্গে নতুন রাষ্ট্রদূতকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে নানা প্রত্যাশা।
প্রবাসীদের একাংশের মতে, রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ দায়িত্ব পালনকালে মানবপাচার, অনিয়ম, অবৈধ ব্যবসা এবং প্রবাসীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তুলনামূলক দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। পাশাপাশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তির সুযোগ বৃদ্ধিসহ শিক্ষাক্ষেত্রে কয়েকটি ইতিবাচক উদ্যোগও তাঁর দায়িত্বকালের উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।

বিদায়ের পর পুরোনো খবর নিয়ে নতুন আলোচনা
রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজের মিশর ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তাঁর দায়িত্বকালীন কিছু পুরোনো সংবাদ ও অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় আসতে দেখা যাচ্ছে।
প্রবাসী মহলের একটি অংশের দাবি, রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বকালে যেসব অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দূতাবাস অবস্থান নিয়েছিল, তাঁর বিদায়ের পর সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহল আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে পুরোনো কিছু সংবাদ নতুন করে প্রচার এবং সেগুলোকে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে সচেতন প্রবাসীদের মতে, পুরোনো সংবাদে উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট পৃথকভাবে যাচাই করা জরুরি। কোনো পুরোনো অভিযোগকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলেও তারা মনে করেন।
মানবপাচার ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান
মিশরে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি অংশ মানবপাচার, প্রতারণা, অবৈধ অভিবাসন ও বিভিন্ন ধরনের শোষণের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এসব বিষয়ে দূতাবাসের তৎপরতা এবং সংশ্লিষ্ট মিশরীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগকে প্রবাসীদের একটি অংশ ইতিবাচকভাবে দেখছে।
প্রবাসীদের অভিযোগ, কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজের সময়ে এসব বিষয়ে দূতাবাসের অবস্থান তুলনামূলক কঠোর হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলের একটি অংশ অসন্তুষ্ট হয়েছিল বলে প্রবাসীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
রাষ্ট্রদূতের বিদায়ের পর এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো মহল নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে কি না, সেটিও এখন প্রবাসীদের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
আল-আজহারে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দ্বিগুণ
রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজের দায়িত্বকালেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি বৃত্তির সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ২৪ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে আল-আজহার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও অনুরোধের পর বৃত্তির সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে বর্ধিত বৃত্তির সুযোগ কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে এটি তাঁর দায়িত্বকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাদের প্রত্যাশা, নতুন রাষ্ট্রদূতের সময়েও শিক্ষাক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আরও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
দায়িত্বের শুরুতে চ্যালেঞ্জ, পরে পরিবর্তনের উদ্যোগ
দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে দূতাবাসে কিছু প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা ছিল। তবে রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ দায়িত্ব পালনকালে এসব বিষয়ে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেন এবং দূতাবাসের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্ব দেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি।
প্রবাসীদের একটি অংশেরও মত, তাঁর দায়িত্বকালে দূতাবাসের কার্যক্রম আগের তুলনায় আরও দৃশ্যমান ও সক্রিয় হয়েছে।
নতুন রাষ্ট্রদূতকে ঘিরে প্রবাসীদের প্রত্যাশা
রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজের বিদায়ের পর এখন প্রবাসীদের মধ্যে আলোচনার অন্যতম বিষয়, মিশরে বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে কে দায়িত্ব নেবেন এবং তিনি প্রবাসীদের স্বার্থে কী ধরনের ভূমিকা রাখবেন।
সাধারণ প্রবাসী, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, নতুন রাষ্ট্রদূত এমন একজন দক্ষ ও দৃঢ়চেতা কূটনীতিক হবেন, যিনি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে বাংলাদেশি নাগরিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবেন।
তাদের দাবি, মানবপাচারকারী চক্র, প্রতারণা, অবৈধ ব্যবসা এবং প্রবাসীদের শোষণের সঙ্গে জড়িত যেকোনো চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে দূতাবাসকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
একই সঙ্গে আল-আজহারসহ মিশরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, ভর্তি, কনস্যুলার সেবা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির যে ধারা তৈরি হয়েছে, তা অব্যাহত রাখার প্রত্যাশাও রয়েছে।
ব্যক্তির পরিবর্তন নয়, নীতির ধারাবাহিকতা চান প্রবাসীরা
প্রবাসীদের মতে, রাষ্ট্রদূতের পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। তবে একজন রাষ্ট্রদূতের সময়ে নেওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ যেন তাঁর বিদায়ের সঙ্গে শেষ হয়ে না যায়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের প্রত্যাশা, নতুন রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব গ্রহণের পর মিশরে বাংলাদেশি নাগরিকদের স্বার্থে চলমান ইতিবাচক কার্যক্রমগুলো পর্যালোচনা করে আরও কার্যকর করবেন। পাশাপাশি পুরোনো কোনো অভিযোগ কিংবা নতুন কোনো অভিযোগ সামনে এলে তা যেন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাবমুক্ত থেকে যথাযথ তদন্ত, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়।
রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজের বিদায়ের পর পুরোনো খবরের পুনরুত্থান এবং বিভিন্ন মহলের নতুন তৎপরতা নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট: নতুন রাষ্ট্রদূতের কাছে প্রবাসীদের প্রত্যাশা শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা চান শক্তিশালী, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং প্রবাসীবান্ধব একটি দূতাবাস।










